ঢাকার মেয়র

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনেই বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে মেয়র পদে পৌনে দুই লাখ ভোটের বড় ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস। আর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচনে গত রাতে সর্বশেষ ফল ঘোষণা অনুযায়ী মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম এক লাখ ৭২ হাজার ৯৬১ ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। মোট এক হাজার ৩১৮ কেন্দ্রের মধ্যে ১১৩টি কেন্দ্রের ফল ঘোষণা বাকি ছিল। ফলে অবশিষ্ট কেন্দ্রের মোট ভোট আতিকের বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।

গতকাল শনিবার রাত পৌনে ১টায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বেসরকারি ফল ঘোষণা হয়। এতে নৌকা প্রতীকে শেখ ফজলে নূর তাপস পেয়েছেন চার লাখ ২৪ হাজার ৫৯৫ ভোট এবং তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ইশরাক হোসেন ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন দুই লাখ ৩৬ হাজার ৫১২ ভোট। ভোটের হার ২৯ শতাংশ। রাত ১টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত সর্বশেষ ফল ঘোষণা অনুযায়ী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এক হাজার ২০৫টি কেন্দ্রের বেসরকারি ফল অনুযায়ী নৌকা প্রতীকে আতিকুল ইসলাম পান চার লাখ ১৫ হাজার ৮০২ ভোট এবং তাঁর নিকটতম ধানের শীষ প্রতীকের তাবিথ আউয়াল পান দুই লাখ ৪২ হাজার ৮৪১ ভোট।

এর আগে গতকাল ভোটারের কম উপস্থিতি এবং বিক্ষিপ্ত কিছু সংঘর্ষ ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয় দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ভোট চলাকালে অনেক কেন্দ্রের ভোটকক্ষেই ক্ষমতাসীন দলের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির প্রার্থীদের এজেন্ট পাওয়া যায়নি। অনেক ভোটকেন্দ্রের সামনে কর্মী-সমর্থকদের তুলনায় ভেতরে ভোটারের উপস্থিতি অনেক কম দেখা যায়।

এই প্রথম দুই সিটির সব কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার হওয়ায় ভোটাররা ভোটের নতুন অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে বিড়ম্বনাও হয়েছে। আঙুলের ছাপ মেলাতে সমস্যা হয়েছে খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদার। গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীও একই সমস্যায় পড়েন। রাজধানীর ধানমণ্ডিতে কাকলি হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভোট দিতে গিয়ে তাঁর আঙুলের ছাপ মেলেনি। পরে প্রিসাইডিং অফিসার নিজ ক্ষমতাবলে তাঁর ভোটটি দিয়ে দেন।

উত্তরের মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের মা গুলশানের মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ৩ নম্বর নারী বুথে ভোট দিতে গিয়ে একই অবস্থার শিকার হন। এ ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে অনেককে। উত্তরের রিটার্নিং অফিসার আবুল কাশেম সকাল পৌনে ১১টার দিকে বলেন, ‘আমাদের তরুণ প্রজন্ম ঘুম থেকে দেরিতে ওঠায় ভোটার উপস্থিতি কম।’

কয়েকটি কেন্দ্রে ভোট দিতে বাধা দেওয়া এবং আঙুলের ছাপ নিয়ে ভোট দেওয়া হয়ে গেছে বলে ভোটারকে জানিয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের ঢুকতে না দেওয়া এবং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগও করেন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থী। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিভিন্ন কেন্দ্রের ২০০ এজেন্টকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ করেছে ইসলামী আন্দোলন। কয়েকজন সাংবাদিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। একজন কাউন্সিলর প্রার্থীর অস্ত্রধারী কর্মীদের ছবি তোলার সময় কালের কণ্ঠ’র প্রধান আলোকচিত্রী শেখ হাসানকে মারধর ও তাঁর ক্যামেরা কেড়ে নেওয়া হয়। কয়েকটি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর এজেন্টকে গোপন বুথে অবস্থান করতেও দেখা যায়। এসব বিক্ষিপ্ত ঘটনা বাদে দুই সিটির পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ। এ নির্বাচনে অতীতের কয়েকটি নির্বাচনের মতো ভোট বর্জনের ঘটনা ঘটেনি।

ভোট চলাকালে সকাল ১১টার দিকে রাজধানীর উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরের আইইএফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নিজের ভোট দিয়ে বের হয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘কেন্দ্রে টিকে থাকার জন্য বিএনপির এজেন্টদের তো সামর্থ্য থাকতে হবে।’ কিছু অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা এ ধরনের নির্বাচন চাইনি।’ তবে তিনি এ কথাও বলেন, ‘ভোটের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট।’

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার উত্তর সিটি করপোরেশনের ইস্পাহানি বালিকা বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে বিএনপির এজেন্ট খুঁজে পাননি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘আস্থাহীনতার কারণে ভোটার উপস্থিতি কম হয়েছে।’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভোট শেষে বিকেল সাড়ে ৪টায় বলেন, ‘ক্ষমতাসীনরা সারা দেশ থেকে লোকজন ঢাকায় এনেছে। কেন্দ্রে কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে যা বলতে গেলে শেষ হবে না। নির্বাচন এতটুকু সুষ্ঠু হয়নি। রাত ৮টায় তিনি এ নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে ঢাকায় আজ রবিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছেন।

অপরদিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী হাসান মাহমুদ বলেছেন, ‘প্রথম থেকেই বিএনপির চেষ্টা ছিল নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। নানা ধরনের অভিযোগ নির্বাচনী প্রচারের সময় তারা উপস্থাপন করেছিল।’ দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘১০০ বছরের ইতিহাসে এমন সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি।’

সকালে মানিক মিয়া এভিনিউর রাজধানী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। ভোট দিয়ে তিনি বলেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হচ্ছে। কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেওয়া হচ্ছে এমন অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপি সব সময়ই কমপ্লেইন করে। এমনটা হলে ইসিতে অভিযোগ করুক। ইসি ব্যবস্থা নেবে।’

ভোট গ্রহণ শেষে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মেয়রপ্রার্থী ডা. আহাম্মদ সাজেদুল হক রুবেল বলেন, ‘জনগণের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করতে নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।’

গত রাত ৮টায় সিইসি বলেন, ৩০ শতাংশের মতো ভোট পড়েছে। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার প্রায় একই সময় বলেন, ২৫ শতাংশের নিচে ভোট পড়েছে।

সকালে ভোট শুরু হওয়ার পর কয়েকটি এলাকায় কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর সঙ্গে একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়াধাওয়ি হয়। সকাল ৯টার দিকে গেণ্ডারিয়া হাই স্কুল কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এসি প্রতীকের মিনুর অনুসারীরা দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ঘুড়ি প্রতীকের নির্বাচনী বুথ ভেঙে দেয়। এর কিছুক্ষণ পর মিনুর অনুসারীরা ফরিদাবাদ হাই স্কুলে ঢুকে ঘুড়ি প্রতীকের পোলিং এজেন্টদের পরিচয়পত্র কেড়ে নিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়। পাশের ফজলুল হক মহিলা কলেজ কেন্দ্রের গেটে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়াধাওয়ির ঘটনা ঘটে।

সকালে আদাবরের ৩০ নম্বর ওয়ার্ড ইকরা স্কুল কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আবুল কাসেম হাসুর সমর্থকরা বিদ্রোহী প্রার্থীর লোকজনকে মারধর করে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। মিরপুরের আদর্শ স্কুল কেন্দ্রেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দারুসসালাম থানার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে হুমকি দিয়ে ১২ নারী পোলিং এজেন্টকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।

ঢাকা দক্ষিণের ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী আবুল কালাম আজাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ভোটকেন্দ্র দখলে রাখার অভিযোগ ওঠে। পুরান ঢাকার বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে এমন বিশৃঙ্খলার ঘটনার অভিযোগ পাওয়া যায়। এ ছাড়া ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেওয়া, প্রতিপক্ষের সমর্থকদের মারধর, এজেন্টদের বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে।

দক্ষিণের ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মো. আব্দুর রহমান মিয়াজী ও বিদ্রোহী প্রার্থী মো. শাহাবুদ্দিন জনির সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়াধাওয়ি হয়। এ সময় বাংলাবাজার গার্লস স্কুল কেন্দ্রে আধাঘণ্টা ভোটগ্রহণ বন্ধ থাকে। পরে পুলিশ ও বিজিবি এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। এ ছাড়া এ কেন্দ্রে বিএনপির কোনো এজেন্ট পাওয়া যায়নি।

সকাল ৯টার দিকে ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের ৪৯ নম্বর নারিন্দা সমিতির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্র ঘিরে রাখা হয়। সেখানে পরিচিত ছাড়া কাউকে ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরে বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মকবুল ইসলাম খান টিপু ভোট দিতে এলে তাঁকে কেন্দ্রে আটকে রাখে তারা। বিএনপির সমর্থকরা তাঁকে ছাড়াতে এলে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের সঙ্গে ধাওয়াধাওয়ির ঘটনা ঘটে। এতে দুই গ্রুপের বেশ কয়েকজন আহত হয়।

সকালে কলাবাগানের খান হাসান স্কুল কেন্দ্রে ১৬নং ওয়ার্ডের একজন কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হন। এ ছাড়া ২২নং ওয়ার্ডের হাজারীবাগ থানার সালেহা স্কুল ও নবাবগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিএনপির মেয়র ও দলটির সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর এজেন্টকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের বকশীবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থী ও বিএনপির প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়াধাওয়ি হয়। এ সময় অন্তত আটটি ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়।

ঢাকা উত্তরের ১৬নং ওয়ার্ডের ইব্রাহিমপুরে মনিপুর হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ শাখা-২ ভোটকেন্দ্রের সামনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের গাড়িতে দুপুর ১২টার দিকে ককটেল হামলার অভিযোগ পাওয়া যায়। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, কেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে পাঁচটি ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। এ সময় চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ ভোট। ভোটাররা তেমন আসেননি। কেন্দ্রের বাইরে একপক্ষের লোকজনের ভিড়। এতে সাধারণ ভোটারদের ভোটের প্রতি, নির্বাচন কমিশনের প্রতি এ অনাস্থার প্রকাশ ঘটেছে।’

– নিউজ ডেস্ক / খলিফা নিউজ